টুকি এইমুহুর্তে শুয়ে আছে কুষ্টিয়াগামী কোনো একটা বাসের মধ্যে। সে বাংলাদেশে এসেছে সূদুর ইংল্যান্ড থেকে। টুকির জন্মের পর ওর বাবা ওর মুখ দেখে বলেছিলো, 'দোয়া রইলো, অনেক বড় হও জীবনে।'
অথচ টুকিরা কখনো ১২৫ ন্যানোমিটারের থেকে বেশি বড় হয়না। হ্যা ঠিকই ধরেছেন, টুকি একজন করোনা ভাইরাস। মানুষের স্যাতসেতে ফুসফুসের আরামদায়ক পরিবেশে ওর জন্ম। তবে সব করোনাকেই জীবনে একটা পরীক্ষার সম্মুখিন হতে হয়৷ বাপের বাড়ি ছেড়ে যেতে হয় নিজের বাড়ি। এসময় হাচি, কাশি বা থুতুর মাধ্যমে বাপের বাড়ির ফুসফুস থেকে বের হয়ে বাইরের দুনিয়ায় টিকে থাকতে হয় কমপক্ষে গড়ে বারো ঘন্টা৷ স্থান বিবেচনায় কেউ বেশি কেউবা কম। তারপর কোনো মানুষের হাত হয়ে মুখ, নাক, বা চোখ দিয়ে তার ফুসফুসে ঢুকে বাসা বাধতে হয়৷ করোনা ভাইরাসদের নিজের আসল বাড়িই সেটা৷ যেখানে সে সংসার করে, বাচ্চা জন্ম দেয়, নিজের স্বপ্ন পূরণ করে, বেঁচে থাকে বহুদিন।
টুকির এখন সেই বারো ঘন্টা চলছে। সে কি বাইরেই মারা যাবে নাকি কোনো মানুষের ফুসফুসে ঢুকে দীর্ঘ একটা জীবন পাবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।
.
জন্মের পরপর টুকি মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে এই বারো ঘন্টার জন্য প্রস্তত হয়েছে। ওর মায়ের নাম শিনতা। ওর মায়ের জন্ম চায়নাতে৷ সেখান থেকে ওর মা ইংল্যান্ড আসে। চায়নাতেই প্রথম করোনা সভ্যতার সূচনা করেন ওদের জাতীর পিতা খ্যাত মি থিং।
ওদের সবাইকে ছোটবেলায় মি থিং এর বিরত্বের গল্প পড়ানো হয়৷ শোনানো হয়। কিভাবে চায়নার একটা শহর থেকে বিপ্লব শুরু করে আস্তে আস্তে পুরো পৃথিবীতে ওরা ছড়িয়ে পড়ল, সেইসব গল্প। কিভাবে ইতালি দখল করলো, স্পেন দখল করলো, কত বীর ভাইরাসের আত্নত্যাগ, কত বিজ্ঞানী ভাইরাসের গবেষণা এর পেছনে লুকানো, সব মায়ের কাছে শুনেছে টুকি। টুকিরও স্বপ্ন বড় হয়ে বিজ্ঞানী হবে। শুধুমাত্র একবার কারো ফুসফুসে জাকিয়ে বসতে পারলেই শুরু করবে গবেষণার কাজ। করোনা ভাইরাসদের সারাবিশ্বে এই বিপুল সফলতার পেছনে তো এইসব বিজ্ঞানীদের অবদানই বেশি। যারা গবেষণা করে নিজেদেরকে ৩৮০ বার মিউটেড করেছে। নিজেদের আর এন এ চেঞ্জ করে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন নতুন এলাকায়। নতুন নতুন মানুষের মধ্যে। অথচ সাধারণ করোনাদের কাছে হিরো হলো প্রিন্স চার্লসের ফুসফুসে যে গেছে সে৷ টম হ্যাংসকে যে আক্রমণ করেছে সে। এসব করোনাদেরকে বলা হয় সেলিব্রেটি, এদের নিয়েই যত মাতামাতি। পাড়ায় পাড়ায় এদের গল্প৷ বাচ্চারা এদের মত হতে চায়। মা বাবা তার বাচ্চাকে বলে বড় হয়ে কোনো মন্ত্রী বা বিখ্যাত মানুষের ফুসফুসে যাবি৷ অথচ যারা নিরবে কাজ করে যায়, সেইসব গবেষক করোনারা রয়ে যায় পাদপ্রদীপের আড়ালেই। খুব রাগ লাগে টুকির। সে মানুষকে বুঝাতে পারে না যে তাদের উন্নতির পেছনে কনিকা কাপুরকে আক্রমণ করার চাইতে কোনো গবেষকের অবদান ঢের বেশি। কিন্তু ভাইরাসরা নিজের ভালো বোঝে না৷ সবখানেই গ্ল্যামারের জয়জয়কার।
.
এজন্যই আজকাল আর করোনাবুকে ঢোকেই না টুকি। নতুন কোনো মিউটেশন হওয়া করোনার ছবিতে লাইক নাই, দুনিয়ার লাইক অমুক মানব সেলিব্রেটিকে আক্রমণ করা করোনার ছবিতে। তাছাড়া সবার করোনাবুক জুড়ে কতশত গুজব যে সারাদিন ছড়ানো হচ্ছে তার ইয়ত্তা নাই। কেউ বলছে, 'মানুষের পাছায় বেশিক্ষণ অবস্থান করবা না৷ মানুষ একটু পর পর গরম পানি দিয়ে ওখানে ধোবে। তখন তুমি মারা যাবা।'
আবার কেউ ফরোয়ার্ড করছে, 'কাঠাল পাতা যারা খায় সেইসব মানুষকে আক্রমণ করে লাভ নাই। ওদের করোনা হয় না।'
কেউ বলছে, 'সোমালিয়ায় মানুষের ফুসফুসে সরকার আটশো ক্যান্সারের জীবানু ছেড়ে দিয়েছে। করোনা সেখানে ঢুকলেই মারা যাচ্ছে।'
.
কিছুদিন একটা গুজব ভয়েস রেকর্ড খুবই ভাইরাল হয়েছিলো। সেখানে এক করোনা আরেক করোনার উদ্দেশ্যে বলছে, 'সোহান, তুমি আল্লাহর নাম নাও। তুমি মানুষের ফুসফুসে যেও না। ওখানে খুব বিপদ। মানুষ ভ্যাক্সিন আবিস্কার করে ফেলেছে। আজ সারাদিন ত্রিশ হাজার ভাইরাস মারা গেছে। আমি এখানে আছি। আমিও মারা যাব হয়ত। কি যে হবে আল্লাহ জানে।'
.
আরেকবার এক 'মালিং মারাং' নামের এক চাইনিজ করোনা নাকি স্বপ্নে মানুষের ইন্টারভিউ নিয়েছে। মানুষটা তাকে বলেছে, 'যেসব ভাইরাস ধর্ম মানে তাদের হ্যান্ড স্যানিটাইজারে কিছু হয়না। সাবানের মধ্যেও তারা বেঁচে থাকে। সে নাকি সাবান থেকে বাঁচার একটা সূত্রও দিয়েছে।'
.
এসবের সবই হলো গুজব। কতৃপক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে গুজবে বিশ্বাস করবেন না। কাঠাল পাতা বা গরম পানি খাওয়াতে করোনাদের কিছু হয় না৷ এর কোনো ভ্যাক্সিন আবিস্কার হয়নি। এসব বলে করোনাদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করছে কিছু ভাইরাস। এগুলো মিথ্যা। তাছাড়া করোনা আটকাতে ক্যানসারের জীবানু যে কেউ দিবে না এটা তো কমন সেন্স। করোনাতে না মরলেও তখন ওরা ক্যান্সারেই তো মরবে। সুতরাং গুজব ছড়ানো ও বিশ্বাস করা ভাইরাসদের জন্য খুব ক্ষতিকর। অথচ এগুলো বিশ্বাস করেই অকালে মারা যাচ্ছে ভাইরাসের দল। যারা এগুলো ছড়ায় আর বিশ্বাস করে, তাদেরকে ভাইরাস বলতেও রাজি না টুকি। তার মতে ওরা ভাইরাসরুপি একেকজন মানুষ৷
.
সারাদিন 'কে টিভি'তে দেখানো হচ্ছে, প্লিজ কেউ ফুসফুসের বাইরে বেরোবেন না। বাইরে থাকা সমস্ত ভাইরাসকে বলা হচ্ছে সুযোগ পেলে ফুসফুসে ঢুকে যান। হাতে যারা আছেন তারা হাত মুখে দিলেই নাক, চোখ বা মুখের মধ্যে ঢুকে পড়ুন। সেখানে আগে থেকে অবস্থাম নেয়া বিভিন্ন অক্ষতিকর ভাইরাসদের জিজ্ঞেস করলেই ফুসফুসের রাস্তা দেখিয়ে দেবে৷ প্রথমে গলা দিয়ে সোজা কিছুদুর যাবেন। তারপর হালকা উপরে উঠে ডানে মোড় নিলেই ফুসফুস। মাত্র চৌদ্দটা দিন ফুসফুস কোয়ারেন্টাইনে থাকুন। তাহলেই আমরা মানুষের বিরুদ্ধে হওয়া এই যুদ্ধে জয়ী হবো।
.
অথচ বহু ভাইরাস এসব বিশ্বাস না করে গুজব বিশ্বাস করছে। কথা শুনছে না। ফুসফুসে না ঢুকে বাইরে অবস্থান করে দলে দলে মারা যাচ্ছে। আসলে মানুষের থেকে এক ভাইরাস আরেক ভাইরাসের জন্য বেশি ক্ষতিকর। কথাটা বলেছিলো টুকির চাইনিজ মা শিনতা। ওর মা ওকে সবসময় বলতো, 'কখনো সেলিব্রেটিদের ফুসফুসে যাওয়ার স্বপ্ন দেখবা না। নিজে কিছু করে বিখ্যাত হবা। অন্যের ফুসফুসে ভর করে বিখ্যাত হওয়ার মধ্যে কোনো গর্ব নেই।'
ওর মা ওকে বড় বড় বিজ্ঞানী ভাইরাসদের গল্প শোনাতো। আর বলত, কখনো খুব বেশি আশা করবা না জীবন নিয়ে। ভাইরাসদের জীবনটা বড় সংগ্রামী জীবন। কতো লক্ষ লক্ষ ভাইরাস বাইরে বের হয়েই মারা যায়। কত লাখ ভাইরাস মানুষের হাতে গিয়ে হ্যান্ডওয়াশে মারা যায়। কতজন ফুসফুসে ঢুকেও বাঁচতে পারে না তাদের ইমিউনিটি সিস্টেমের কাছে। ভাইরাসদের জীবন তাই যুদ্ধের মতন। কখনো মন খারাপ করবা না। সাধারণ কারো ফুসফুসে বাসা বাধতে পারলেও বুঝবা তুমি সফল।'
.
কুষ্টিয়াগামী বাসের এক সিটের হাতলে শুয়ে শুয়ে টুকি ওর মায়ের কথাই ভাবে। ওকে কি কেউ হাতে নেবে? সেই হাত কি নাকে মুখে দেবে? ওর জীবনে কি একটা দূর্বল ফুসফুসে বাসা বাধার স্বপ্নটা পূরণ হবে? টুকির চোখে জল চলে আসে। করোনা ভাইরাসদের জীবনটা এতো দুঃখের কেন!
.
ভাবতে ভাবতেই কিছুর স্পর্শে দুইবার হার্টবিট মিস হলো টুকির। ইয়েস, একটা হাত। একটা হাত ওকে স্পর্শ করেছে। পেরেছে টুকি। একজনের হাতে উঠতে পেরেছে। নিজের ভাগ্যকে নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না ওর। জীবন্ত একটা হাত। আহা! এতো সৌভাগ্যও হয় ভাইরাসদের! এখন শুধু হাত থেকে মুখে যাওয়ার অপেক্ষা। বিখ্যাত মানুষ বিশেষজ্ঞ ভাইরাসদের মতে এই সময়টাই সবচাইতে চ্যালেঞ্জিং। মানুষটা যেকোনো সময় সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে পারে। হাত ধুলেই নির্ঘাত মৃত্যু। এই সময়টা নির্ভর করে ভাইরাসের ভাগ্য আর অসচেতন মানুষটার বোকামির ওপর৷
.
টুকি খেয়াল করে দেখে ও যার হাতে উঠেছে সে একুশ বাইশ বছরের একটা যুবক। ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে গান শুনছে ইয়ারফোনে। এটাই তো দরকার ওর। ড্যাম কেয়ার ভাব নেয়া মানুষগুলোই সবচাইতে ভালো মাধ্যম নিজেকে ফুসফুসের লক্ষ্যে পৌছে নেয়ার৷
.
টুকিরা কখনো একা থাকে না। এই মুহুর্তে টুকির সাথে আরো কয়েক হাজার ভাইরাস আছে৷ যারা কেউ বাসের সীটে রয়ে গেছে কেউ টুকির সাথে উঠেছে ছেলেটার হাতে। ছেলেটা যখন বাস ভাড়া দিল তখন টাকার সাথে চলে গেল কেউ কেউ। টুকি হাতেই থাকলো। ছেলেটা বাসায় যাওয়ার পর গেট খুললে কেউ কেউ গেল গেটে৷ টুকি অপেক্ষা করছে আসল সুযোগের। সে মুখে যেতে চায়৷ ছেলেটা বাসায় ঢোকার সাথে সাথেই তার আম্মু বললো, 'রনি, হাতটা ধুয়ে ফেল সাবান দিয়ে।'
রনি নামের ছেলেটা 'একটু পর ধুচ্ছি' বলে সোফায় বসে পড়লো। এবার সোফার হাতলে চলে গেল টুকি। সে বুদ্ধি করে দেখলো রনির ফুসফুসে গেলে সুবিধা নাও হতে পারে। তাছাড়া সে হাত ধুতে যাবে। আগে নিজে বাঁচলে পরে অন্যকিছু। আর সোফার হাতল আরো অনেকেই হাত রাখবে বাসার।
ওর বুদ্ধিটাই কাজে লেগে গেলো। একটু পর রনীর বাবা হাত রাখলো সোফায়। টুকি দ্রুত বৃদ্ধ লোকটার হাতে চলে গেল। লোকটা সেই অবস্থাতেই হাত না ধুয়ে টেবিলে খেতে বসেছে। জিহবার স্বাদ পেল টুকি। বড়সড় একটা নিঃশ্বাস ফেললো। আর চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফুসফুসে যাওয়ার রাস্তা দেখা যাচ্ছে সামনেই। যে রাস্তা ওর জন্য অপেক্ষা করছে উজ্জ্বল এক ভবিষ্যৎ নিয়ে।
.
টুকির সাথে যত ভাইরাস ফুসফুসে এসেছে সবাই মহানন্দে নিজেদের সংসার গোছানো শুরু করেছে৷ ইমিউনিটি সিস্টেমকে যুদ্ধে হারানো গেছে। আর কোনো টেনশন নেই৷ টুকি রিল্যাক্স মুডে বহুদিন পর করোনাবুকে ঢুকে একটা স্ট্যাটাস দিলো, 'দশ কে কমেন্ট এবং আমি এই মানুষটাকে কাশিতে আক্রান্ত করাবো।'
প্রচুর কমেন্ট পড়া শুরু হয়েছে। টুকির খুব খুশি লাগছে। জীবনটা ও যতোটা ভেবেছিলো ততটাও খারাপ না আসলে!
.
রনির বাবা মোতালেব সাহেবের রাত থেকে হালকা জ্বর আর কাশি হচ্ছে। আইইডিসিয়ারের হটলাইনে ফোন দেয়ার পর বলা হলো, বিদেশি কারো সংস্পর্শে না আসলে টেস্ট করানো হবে না৷ তাছাড়া কুষ্টিয়াতে টেস্ট করানোর মত অবস্থা বা ব্যবস্থা কোনোটাই নেই।
মোতালেব সাহেব ঘরে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন। ডাক্তাররা বলেছে শ্বাসকষ্ট না হলে টেনশনের কিছু নেই।
মোতালেব সাহেব মনে মনে ভাবলেন, 'উনার শ্বাসকষ্ট হবেনা সম্ভবত।'
কিন্তু উনি ঘূর্ণাক্ষরেও জানতে পারলেন না টুকি তখন করোনাবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে, 'দুই ঘন্টায় ত্রিশ কে কমেন্ট আর আমি লোকটার শ্বাসকষ্ট টের পাওয়াবো।'
আর সেই স্ট্যাটাসে আধাঘন্টায় ই বিশ হাজার কমেন্ট পড়ে গেছে....!

0 Comments